নিউজ ডেস্ক :
পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার জন্মদাত্রী এই নদী।
চীনের উত্তরাঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া হুয়াং হু নদী শুধু একটি নদী নয়; এটি চীনা সভ্যতার জন্মদাত্রী। প্রায় ৫ হাজার ৪৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীকে বলা হয় “মাদার রিভার অব চায়না”। তিব্বতের মালভূমি থেকে উৎপন্ন হয়ে নদীটি নয়টি প্রদেশ অতিক্রম করে বোহাই সাগরে মিলিত হয়েছে।
তবে এই নদীর আরেকটি পরিচয় আরও বেশি আলোচিত— “চীনের দুঃখ”। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভয়াবহ বন্যা, নদীপথ পরিবর্তন এবং লাখো মানুষের মৃত্যু হুয়াং হুকে দিয়েছে এই নির্মম উপাধি।
কেন ‘চীনের দুঃখ’?
হুয়াং হু নামের অর্থই হলো “হলুদ নদী”। নদীর পানিতে বিপুল পরিমাণ হলুদাভ পলিমাটি থাকার কারণে এর এমন নামকরণ। লোস মালভূমি থেকে ভেসে আসা সূক্ষ্ম পলি নদীর পানিকে করে তোলে ঘোলাটে ও হলুদ রঙের।
সমস্যার মূলও এখানেই। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পলিবাহী নদীগুলোর একটি হুয়াং হু। প্রতি বছর বিপুল পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যায়। ফলে অনেক স্থানে নদীটি আশপাশের জনপদের চেয়েও উঁচু দিয়ে প্রবাহিত হয়। বাঁধ ভেঙে গেলে পানি মুহূর্তেই গ্রাম-শহরে নেমে আসে, সৃষ্টি হয় ভয়াবহ বিপর্যয়।
ইতিহাস বলছে, গত প্রায় তিন হাজার বছরে হুয়াং হু প্রায় দেড় হাজারের বেশি বার ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করেছে এবং অসংখ্যবার নিজের গতিপথ বদলেছে।
ইতিহাসের ভয়াবহ বন্যা,
১৮৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যাকে মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ধরা হয়। ওই বন্যায় আনুমানিক ৯ লাখ থেকে ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর ১৯৩১ সালের বন্যা আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। দুর্ভিক্ষ ও রোগব্যাধিসহ সেই বিপর্যয়ে কয়েক মিলিয়ন মানুষের প্রাণহানি ঘটে বলে ধারণা করা হয়।
১৯৩৮ সালে দ্বিতীয় চীন-জাপান যুদ্ধের সময় চীনা বাহিনী জাপানি সেনাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ইচ্ছাকৃতভাবে নদীর বাঁধ ভেঙে দেয়। এতে বিশাল এলাকা প্লাবিত হয় এবং লাখো সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইতিহাসে এটি যুদ্ধকৌশল হিসেবে ব্যবহৃত সবচেয়ে ভয়াবহ মানবসৃষ্ট বন্যাগুলোর একটি।
সভ্যতার আশীর্বাদও ছিল এই নদী,
ভয়াবহতার পাশাপাশি হুয়াং হু চীনের কৃষি ও অর্থনীতির জন্য ছিল আশীর্বাদ। নদীর পলিমাটি উত্তর চীনের সমভূমিকে করেছে অত্যন্ত উর্বর। গম, ভুট্টাসহ নানা শস্য উৎপাদনে এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
চীনের বহু প্রাচীন নগর, সংস্কৃতি ও রাজবংশের উত্থান ঘটেছে এই নদীকে কেন্দ্র করে। ইতিহাসবিদদের মতে, হুয়াং হু অববাহিকাই ছিল প্রাচীন চীনা সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র।
আধুনিক চীনের লড়াই,
বিগত কয়েক দশকে চীন সরকার নদী নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। বড় বড় বাঁধ, জলাধার, ডাইক নির্মাণ এবং বনায়ন প্রকল্পের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত শিল্পায়নের কারণে নতুন ধরনের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। কোথাও পানির স্বল্পতা, কোথাও আবার অতিবৃষ্টি— দুই ধরনের সমস্যাই এখন হুয়াং হুকে ঘিরে দেখা দিচ্ছে।
তবু নদীটি এখনও চীনের অর্থনীতি, কৃষি ও সংস্কৃতির প্রাণরেখা হিসেবে টিকে আছে।
প্রকৃতির শিক্ষা,
হুয়াং হু নদীর ইতিহাস মানুষকে এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়— প্রকৃতিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কখনোই সহজ নয়। যে নদী একদিকে সভ্যতার জন্ম দেয়, অন্যদিকে সেই নদীই মুহূর্তে ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।
তাই “চীনের দুঃখ” নামে পরিচিত হলেও, হুয়াং হু আসলে চীনের ইতিহাস, সংগ্রাম ও টিকে থাকার প্রতীক।
