বিশেষ প্রতিনিধি : মোঃ শামীম রেজা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান পরিচালনাকালে র্যাবের ওপর ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে র্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন এবং আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে এ হামলার ঘটনা ঘটে। নিহত কর্মকর্তার নাম আবদুল মোতালেব। তিনি চট্টগ্রাম র্যাবের উপসহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং আগে বিজিবিতে কর্মরত ছিলেন। তার মৃত্যুর বিষয়টি পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ নিশ্চিত করেছেন।
একই ঘটনায় আহত র্যাব সদস্য ও কর্মকর্তাদের উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পুলিশ ও র্যাবের অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়। পুরো এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিকেলে পতেঙ্গা র্যাব ব্যাটালিয়নের একটি দল আসামি গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান শুরু করে। এ সময় সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা র্যাবের চার সদস্য ও একজন সোর্সকে আটক করে মারধর করে। পরে অতিরিক্ত বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে জিম্মিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠালে চিকিৎসক আবদুল মোতালেবকে মৃত ঘোষণা করেন।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মহিনুল ইসলাম জানান, হামলার সংবাদ পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং আহতদের উদ্ধার করা হয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও একাধিকবার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, র্যাব, পুলিশ ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সদস্যদের ওপর হামলা হয়েছে। সংবাদ সংগ্রহে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরাও।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় চার দশক ধরে সলিমপুর ইউনিয়নের এই পাহাড়ি এলাকায় সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে হাজারো অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বহিরাগতদের প্রবেশ কার্যত নিয়ন্ত্রিত এবং সশস্ত্র পাহারায় এলাকা পরিচালিত হয়।
জঙ্গল সলিমপুরের আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর। জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এ অঞ্চলের খাস জমির বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিপুল এই অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দখল, সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড চলমান।
গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সশস্ত্র দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়। পাহাড় দখলকে কেন্দ্র করে একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি দুই পক্ষের গোলাগুলিতে একজন নিহত হওয়ার পর সেখানে সংবাদ সংগ্রহে গেলে হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক।
এর আগেও উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গিয়ে প্রশাসনকে বারবার হামলার মুখে পড়তে হয়েছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এক অভিযানের পর ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালেও র্যাব, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর হামলার নজির রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, বাহিনীর গাড়ি এলাকায় প্রবেশ করলেই পাহাড়ে অবস্থানরত সন্ত্রাসীরা আগাম সতর্কতা পেয়ে যায়। এরপর ওপর থেকে গুলি, ককটেল ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। ফলে এককভাবে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
উল্লেখ্য, সরকারি খাস জমিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ অন্তত ১১টি বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলেও জঙ্গল সলিমপুর উদ্ধার না হওয়ায় সেসব প্রকল্প এখনো বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
